রবিবার, ২৮ Jun ২০২৬, ০৬:৪৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ সুদানে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত জাপানে জোট সরকার গড়তে রাজি এলডিপি, ইশিন হামাস যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘন ঘটিয়েছে অভিযোগ করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের ঢল

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রধান বাধা ইভিএম

কাগজের ব্যালটের নির্বাচনের মৌলিকত্ব ও গোপনীয়তা ইভিএম দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি হলেও এটি দিয়ে জালিয়াতির সুযোগ রয়েছে। ইভিএম কেনায় প্রায় ৫০ কোটি ডলার ব্যয় প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। গত নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও প্রতিযোগিতামূলক হয়নি।

এবারের নির্বাচন সবার অংশগ্রহণে করার জন্য প্রধান প্রতিবন্ধকতা ইভিএম। ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্তে নির্বাচন কমিশনের ওপর অনেকেই আস্থা হারিয়েছে।

গতকাল রবিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের উপযোগিতা’ শীর্ষক আলোচনায় সংগঠনটির সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার এ কথা বলেন।

আলোচনাসভায় ইভিএমের কারিগরি দিক পর্যালোচনা ও নির্বাচনে এর প্রভাব বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রযুক্তিবিদ ও টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। প্রবন্ধে ইভিএমের চ্যালেঞ্জ, অভিযোগ ও সমস্যাসংক্রান্ত ৯টি বিষয় তুলে ধরেন তিনি। সভায় অন্যদের মধ্যে সুজনের সহসম্পাদক জাকির হোসেন, সাবেক সচিব আব্দুল লতিফ মণ্ডল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বদিউল আলম মজুমদার সভায় আরো বলেন, ‘কমিশনাররা বলছেন কেউ নাকি ইভিএমে হ্যাক হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করতে পারেনি। ইভিএমে বাইরে থেকে কেউ কারসাজি করতে পারবে না এটা ঠিক, কিন্তু কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন রকমের কারসাজি করার সুযোগ থেকেই যায়। তাই ইভিএমের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। ’

আব্দুল লতিফ মণ্ডল বলেন, ‘আমরা বারবার বলেছি, অংশীজনরা যদি না চায়, তাহলে ইভিএম ব্যবহার করা উচিত হবে না। কিন্তু ইসির সঙ্গে সংলাপে বেশির ভাগ দলই ইভিএম ব্যবহারের বিরুদ্ধে মত দেওয়া সত্ত্বেও জোর করে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্তের কারণ বোধগম্য হচ্ছে না। ’
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব তাঁর প্রবন্ধে বলেন, দেশের সব নাগরিকের নিখুঁত বায়োমেট্রিক তথ্যশালা ঠিকঠাক তৈরি হয়নি বলে নির্বাচন কমিশনে জাতীয় পরিচয়পত্রবিষয়ক (এনআইডি) লাখ লাখ অভিযোগ আছে। নতুন সমস্যা হচ্ছে, প্রায় কোটি নাগরিকের জন্ম নিবন্ধনের তথ্য হারিয়ে যাওয়া। ধারণা করা হচ্ছে, সব মিলিয়ে কমপক্ষে পাঁচ কোটি জন্ম নিবন্ধন একেবারেই গায়েব হয়ে গেছে। ২০২৩ সালের মধ্যে কোটি নাগরিকের জন্ম নিবন্ধন, এনআইডি তৈরিসহ বিদ্যমান এনআইডির কোটি ভুল শুধরানো অসম্ভব। যেখানে নিখুঁত এনআইডি ও বায়োমেট্রিক তথ্যশালাই তৈরি হয়নি, সেখানে ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোটের যৌক্তিকতা কোথায়?

ফয়েজ আহমদ আরো বলেন, একটি কেন্দ্রের সব ভোটারের তথ্য ওই কেন্দ্রের সব ইভিএমে থাকে না বলে একটি ইভিএম হ্যাং করলে বা একটি ইভিএমে ভোটারের বায়োমেট্রিক শনাক্ত করা না গেলে তাঁকে অন্য ইভিএমের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায় না। যদিও নির্বাচন কমিশন থেকে ইভিএমকে ‘কাটিং এজ’ প্রযুক্তি বলা হয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি, ইভিএম সত্যিকার অর্থে একটি হার্ড কোডেড ও ভোটার অবান্ধব মেশিন। পোলিং কার্ড ও অডিট কার্ডের সঙ্গে ভোটকেন্দ্রের সব ভোটারের তথ্য সংযোজন করা নেই বলে ভুলে এক বুথে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ভোটার অন্য বুথের লাইনে গিয়ে ভোট দিতে পারেন না; এমনকি কেন্দ্রভিত্তিক মাস্টার ডাটাবেইস না থাকায় যেকোনো ভোটার যেকোনো বুথে ভোট দিতে পারেন না। ইভিএম ইন্টারনেটে সংযুক্ত নয়, তবে ইন্ট্রানেটে সংযুক্ত। অর্থাৎ যন্ত্রগুলো নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। ফলে ‘বিশেষ প্রভাবশালী’গোষ্ঠী চাইলে এই প্রাইভেট নেটওয়ার্কেরই অন্য কম্পিউটার থেকে ইভিএম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘যন্ত্রটির ভেতরে আগে থেকেই ইনস্টল করা সিম বা কার্ড জাতীয় আইসি (ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট) স্থাপন করে ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই যন্ত্রটিকে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অন্যদিকে অডিট কার্ডের মাধ্যমে কেন্দ্রের বুথ থেকে ফলাফল হস্তান্তরের পরে ওই কেন্দ্রের ফলাফল এবং পুরো আসনের সব কেন্দ্রের ফলাফল দুটিই ম্যানুয়াল প্রসেসের। এখানে অডিট কার্ডের চিপের মাধ্যমেও জালিয়াতি সম্ভব। আর পুরো ইভিএম ভোট প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হলেও শুধু ফলাফল তৈরির ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা করে ফলাফল পাল্টে দেওয়া সম্ভব।

ফয়েজ আহমদ আরো বলেন, বাংলাদেশে যে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে ডিজিটাল অডিট ট্রেইলের ব্যবস্থা আছে যদিও যেকোনো ডিজিটাল অডিট ট্রেইলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে ব্যবস্থাটি যেহেতু সফটওয়্যারচালিত, তাই সোর্স কোডসংক্রান্ত সমস্যাটি এখানে থেকেই যাচ্ছে। নির্বাচনের ঠিক আগে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দিয়ে প্রতিটি ইভিএম মাদারবোর্ড পরীক্ষা করা, পরীক্ষা শেষে প্রতিটি সফটওয়্যারের ডিজিটাল ছাপ (ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট) সংরক্ষণ করা দুরূহ কাজ; বলতে গেলে অসম্ভব। মাঠ পর্যায়ের প্রিজাইডিং অফিসারদের তথ্যের বরাতে তিনি বলেন, বর্তমান ইভিএমের একটি বড় ত্রুটি হচ্ছে মেশিন হ্যাং হওয়া। ব্যক্তির ভোট পরিবর্তন করতে অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক ব্যালটে চাপ ও দ্রুত একাধিক বাটনে চাপ দিলেই মেশিন হ্যাং হয়ে যায়। একবার মেশিন হ্যাং করলেই ৫ থেকে ১০ মিনিট নষ্ট হয়, মেশিন আবার সিনক্রোনাইজেশন বা রিস্টার্ট দিতে হয়। এতে ভোটগ্রহণের হার কমে যায়।

ইভিএমে ভোটগ্রহণ ডিজিটালে করা হলেও ফলাফল ম্যানুয়ালি করতে হয় উল্লেখ করে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, একটি নির্বাচনী আসনের সব কেন্দ্রের মোট ফলাফল হাতে তৈরি করা হয়। কিছু কেন্দ্রের ফলাফল ইভিএমে এবং কিছু কেন্দ্রের ফলাফল হাতে করে একটা অস্বচ্ছ ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। সব কেন্দ্রের ফলাফল ম্যানুয়ালি নিয়ে ম্যানুয়ালি কেন্দ্রের ফলাফল তৈরির পদ্ধতি একদিকে হাস্যকর এবং অন্যদিকে জালিয়াতপ্রবণ। সব কেন্দ্রের ইন্টিগ্রেটেড ফলাফল তৈরি করতে বর্তমান ইভিএম সক্ষম নয়। পোলিং কার্ডের ‘ভোট প্রদানের তথ্য’ অডিট কার্ডে এনে ফলাফল তৈরি করতে হয়। কিন্তু মাস্টার ডাটাবেইস নেই বলে এসব ডাটাবেইস ট্রান্সফার করে ম্যানুয়ালি যোগ করার জঞ্জাল আছে, ফলে এখানে অস্বচ্ছতা তৈরি সম্ভব।

নির্বাচন কমিশনের ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক কর্নেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান এই কারিগরি বিশ্লেষণ সম্পর্কে বলেন, এর প্রতিটি তথ্য কাল্পনিক। বাস্তবের সঙ্গে কোনো মিল নেই।

এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইভিএম নিয়ে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে তা প্রমাণিত নয়। আমরা দেশের সেরা প্রযুক্তিবিদদের দিয়ে ইভিএম পরীক্ষা করিয়েছি। তাঁদের পরীক্ষায় কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা এ মেশিনের প্রশংসা করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোকেও বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ইভিএম পরীক্ষার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিল। সুজনের সংবাদ সম্মেলনে যেসব সমস্যার কথা বলা হয়েছে তা বিস্তারিত জানার আগে মন্তব্য করা উচিত হবে না। ’

বেগম রাশেদা সুলতানা গতকাল খুলনার দিঘিনালা উপজেলার সনহাটি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কর্মসূচি পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের বলেন, যদি প্রমাণিত হয় যে ইভিএমে প্রতারণা করা যায়, তাহলে দেড় শ আসনে ইভিএমে ভোট নাও হতে পারে না।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com